শৈশব, শিক্ষা ও পারিবারিক ইতিহাস
ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইরান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ভিটাবাড়ীয়া ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ রাজাপুর উপজেলা সদরে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কারণে বসবাস করছেন। তাঁর পিতা মাস্টার ইসমাইল হোসেন ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী আদর্শবান মানুষ। মাতা মিসেস মমতাজ বেগম একজন ধর্মভীরু ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন গৃহিণী।
ভিটাবাড়ীয়া বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি। তিনি মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে দাখিল থেকে কামিল পর্যন্ত সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিএইচএমএস উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে তাঁর মন সবসময় সমাজের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় নিমগ্ন। চিকিৎসা পেশাকে মানবসেবার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করলেও, দেশের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াই তাঁকে সরাসরি রাজনীতিতে টেনে আনে।
ছাত্রজীবনে নেতৃত্বের উন্মেষ
বামধারার ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রীর মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করলে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বিশ্বাস তাকে বাংলাদেশ ছাত্র শক্তিতে যুক্ত করে। ছাত্রজীবনে ডাঃ ইরান ছিলেন একজন প্রতিশ্রুতিশীল, সাহসী এবং চিন্তাশীল নেতা। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র শক্তির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।
১৯৯৯ সালে আওয়ামী সরকারের ফ্যাসিবাদী দমননীতির বিরুদ্ধে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কো-কনভেনর হিসেবে নেতৃত্ব দেন। ছাত্র ঐক্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামি ছাত্র শিবির ও জাতীয় ছাত্র সমাজসহ ৭টি ছাত্র সংগঠন যুক্ত ছিল। ঐ বছরই গণতন্ত্র ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে দুইবার কারাবরণ করেন।
ছাত্ররাজনীতিতে তিনি ছিলেন নৈতিকতা, আদর্শ ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
লেবার পার্টির নেতৃত্বে দায়িত্ব গ্রহণ
ছাত্র রাজনীতি শেষে ২০০০ সালে তিনি দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে।
তাঁর নেতৃত্বে দলটি নতুন আদর্শিক ভিত্তি পায়, সংগঠন বিস্তৃত হয় এবং “ইনসাফভিত্তিক জনকল্যাণ রাষ্ট্র” গঠনের আন্দোলন শুরু হয়।
তিনি “রাজনীতি মানে দায়িত্ব” — এই নীতিকে সামনে রেখে দলকে একটি আদর্শিক, সংগ্রামী ও বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
শ্রমিক আন্দোলনে সক্রিয়তা ও গ্রেফতার
বন্ধ কল-কারখানা চালু, কর্মঘণ্টা ও নূনতম মজুরি নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে সক্রিয়ভাবে আন্দোলন-সংগ্রামের ভূমিকা পালন করেন।
২০০৩ সালে তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেফতার হন।
তিনি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ছিলেন অগ্রণী। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যজোটের সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, “শ্রমিকের মুক্তি ছাড়া কোনো প্রকৃত গণতন্ত্র সম্ভব নয়।”
১/১১ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও গ্রেফতার
এক-এগারো (১/১১) সরকারের সময় তিনি ছিলেন প্রথম সারির প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বেগম খালেদা জিয়া ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে সভা-সেমিনার ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তাকে তোপখানা রোড থেকে গ্রেফতার করা হয় এক-এগারোর অপশক্তির হাতে। এ ঘটনার মাধ্যমে তাঁর সংগ্রামী নেতৃত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ৫ বার গ্রেফতার
ডাঃ ইরান বিগত ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন, দুর্নীতি ও প্রতিহিংসার রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। এই সময়ে তিনি ৫ বার গ্রেফতার হন।
২০১২ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিল শাপলা চত্বরে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলার শিকার হন, যা তাঁর জীবনের উপর ছিল একটি গুরুতর আঘাত। তবুও তিনি রাজনীতি থেকে পিছু হটেননি—বরং আরও দৃঢ়চেতা হয়ে জনগণের জন্য লড়াই চালিয়ে যান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ
২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও ছাত্র মিশনের পক্ষ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই আন্দোলনে ঢাকা মহানগর লেবার পার্টির নেতা আউয়াল মিয়া এবং ছাত্র মিশনের সদস্য নাঈম হাওলাদার পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন। এই আত্মত্যাগ তাঁকে ও তাঁর দলকে জনসাধারণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্যতা ও সম্মান এনে দেয়।
রাষ্ট্র মেরামতের চিন্তা ও ৩১ দফা সমর্থন
তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—
- কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার জরুরি।
- জনগণের অধিকার, ইনসাফ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া মুক্তি নেই।
এই বিশ্বাসের জায়গা থেকে তিনি তারেক রহমান ঘোষিত “রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা”-কে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলসমূহের যৌথ প্রস্তাবনার প্রতিফলন হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন।
ওমর-ই সাম্যবাদ : ইনসাফনির্ভর রাষ্ট্রের পথনির্দেশনা
ডাঃ ইরানের অন্যতম অনন্য অবদান হলো বিকল্প রাষ্ট্রদর্শন “ওমর-ই সাম্যবাদ” রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাওয়া।
এই দর্শনের মূল বিষয়গুলো:
- আইন ও বিচার ব্যবস্থায় ইনসাফ।
- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
- জনসম্পৃক্ত বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা।
- ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক নেতৃত্ব।
- নারী, কৃষক, শ্রমিক, তরুণ সমাজের মর্যাদা ও অধিকার।
এটি কেবল তত্ত্ব নয়, বরং বাস্তব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর মডেল।
নির্বাচনী রাজনীতি ও পিরোজপুর-২ আসনে প্রার্থীতা
ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পিরোজপুর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দিনের ভোট রাতে ছিনতাই করে তাকে পরাজিত দেখানো হয়, যদিও তিনি ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছিলেন।
তিনি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ লেবার পার্টির দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঠালিয়া) ও পিরোজপুর-২ (ভাণ্ডারিয়া, কাউখালি, নেছারাবাদ) আসনে নির্বাচনী জনসংযোগে শহর থেকে গ্রাম, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবখানে সাধারণ মানুষের মাঝে ছুটে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি: দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান, কৃষক ও শ্রমিকের অধিকার, নারী ও শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, মাদক-দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই।
এলাকাবাসী মনে করেন, মোস্তাফিজুর রহমান ইরান একজন আদর্শবাদী ও সাহসী জাতীয় নেতা। রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণ ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে তাঁর মতো নেতার প্রয়োজন আজ অতীব জরুরি।